কোন দৃষ্টিকোণ থেকে পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ফার্মকে 'দাম গ্রহীতা' (Price Taker) বলা হয় এবং কেন?

Writer
Writer
Price Taker Thumbnail

বিষয়: ব্যষ্টিক অর্থনীতি (Microeconomics) | অধ্যায়: পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার


ভূমিকা

সাধারণত আমরা মনে করি, যিনি পণ্য উৎপাদন বা বিক্রয় করেন তিনিই তার পণ্যের দাম নির্ধারণ করবেন। কিন্তু পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারের প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই বাজারে কোনো একক বিক্রেতা বা ফার্ম চাইলেই নিজের উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারে না।

অর্থনীতিতে 'দাম গ্রহীতা' (Price Taker) বলতে এমন এক সত্তাকে বোঝায়, যার বাজারের মোট যোগানের ওপর এতটাই নগণ্য প্রভাব থাকে যে, সে এককভাবে পণ্যের বাজার মূল্যে কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রতিটি ফার্মই মূলত একজন দাম গ্রহীতা।

ফার্মকে দাম গ্রহীতা বলার মূল কারণসমূহ

নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য বা দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় কেন এই বাজারের একটি ফার্ম দাম নির্ধারণকারী (Price Maker) না হয়ে দাম গ্রহীতা (Price Taker) হয়:

  • ১. বাজারে ফার্মের ক্ষুদ্র অবস্থান: এই বাজারে অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা থাকে। পুরো শিল্পের মোট উৎপাদনের তুলনায় একটি একক ফার্মের উৎপাদনের পরিমাণ এক বিন্দুর মতো। তাই কোনো ফার্ম যদি তার উৎপাদন দ্বিগুণ করে কিংবা উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধও করে দেয়, তবুও বাজারের মোট যোগানে তার তেমন কোনো প্রভাব পড়ে না। ফলে দামও অপরিবর্তিত থাকে।
  • ২. সমজাতীয় পণ্য (Homogeneous Products): এই বাজারের সকল ফার্ম হুবহু একই রকম পণ্য উৎপাদন করে। পণ্যগুলোর আকার, মান, স্বাদ বা মোড়কে কোনো পার্থক্য থাকে না। তাই কোনো ফার্ম যদি পণ্যের দাম সামান্য বৃদ্ধি করে, তবে ক্রেতারা তার কাছ থেকে না কিনে অন্য ফার্মের কাছ থেকে কিনবে।
  • ৩. বাজার সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান: ক্রেতাদের বাজার দর সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান থাকে। কোনো বিক্রেতা বেশি দাম দাবি করলে ক্রেতা তা সহজেই বুঝতে পারে এবং অন্য বিক্রেতার কাছে চলে যায়। তাই ফার্ম বেশি দাম হাঁকতে পারে না।
  • ৪. অস্বাভাবিক দাম হ্রাসের অক্ষমতা: ফার্ম যদি বাজার দামের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার লাভের পরিমাণ কমে যাবে বা লোকসান হবে। যেহেতু প্রচলিত বাজার দামেই সে তার সকল পণ্য বিক্রি করতে পারে, তাই দাম কমানোর কোনো যৌক্তিক কারণ তার নেই।

"অতএব, এককভাবে দাম কমানো বা বাড়ানোর কোনো ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট ফার্মের হাতে থাকে না। বাজার তার স্বয়ংক্রিয় শক্তি দিয়ে যে দামটি নির্ধারণ করে দেয়, ফার্মকে ঠিক সেই দামেই পণ্য বিক্রয় করতে হয়। এজন্যই ফার্মকে দাম গ্রহীতা বলা হয়।"

কীভাবে দাম নির্ধারিত ও গৃহীত হয়? (চিত্রসহ ব্যাখ্যা)

পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মূলত শিল্প (Industry) পণ্যের দাম নির্ধারণ করে। বাজারের সকল ক্রেতার মোট চাহিদা এবং সকল ফার্মের মোট যোগানের পারস্পরিক ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে শিল্পের ভারসাম্য দাম নির্ধারিত হয়। একটি নির্দিষ্ট ফার্ম কেবল সেই দামটি মেনে নিয়ে নিজের উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারণ করে।

শিল্প বা বাজার (Industry) মোট পরিমাণ (Q) দাম (P) O D (চাহিদা) S (যোগান) E P₀ Q₀ নির্দিষ্ট ফার্ম (Firm) ফার্মের উৎপাদন (q) দাম, আয় (P, AR) O P₀ d = AR = MR = P₀

চিত্র: শিল্পের দাম নির্ধারণ এবং ফার্ম কর্তৃক সেই দাম গ্রহণ

চিত্র বিশ্লেষণ: উপরের চিত্রে দুটি অংশ রয়েছে। বাম দিকের চিত্রে শিল্প বা বাজারের সামগ্রিক অবস্থা দেখানো হয়েছে। বাজারের মোট চাহিদা রেখা (D) এবং মোট যোগান রেখা (S) পরস্পরকে E বিন্দুতে ছেদ করেছে। এর ফলে বাজারে ভারসাম্য দাম P₀ এবং ভারসাম্য পরিমাণ Q₀ নির্ধারিত হয়েছে।

ডান দিকের চিত্রে একটি নির্দিষ্ট ফার্মের অবস্থান দেখানো হয়েছে। শিল্প কর্তৃক নির্ধারিত P₀ দামটি ফার্ম নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেছে। ফার্মটি চাইলে এই দামে ১টি, ১০টি কিংবা ১০০০টি পণ্য বিক্রি করতে পারে, কিন্তু দাম পরিবর্তন করতে পারবে না। এ কারণেই ফার্মের চাহিদা রেখাটি (d = AR = MR) ভূমি অক্ষের সমান্তরাল বা সম্পূর্ণ স্থিতিস্থাপক হয়েছে।


উপসংহার

সার্বিক আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একটি নির্দিষ্ট ফার্ম বা বিক্রেতা দামের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব খাটাতে পারে না। সমগ্র বাজার কাঠামোর চাহিদা ও যোগানের শক্তিতে যে দাম জন্ম নেয়, ফার্মটি শুধুমাত্র সেই দামেই তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য থাকে। আর ঠিক এই দৃষ্টিকোণ থেকেই এই বাজারের ফার্মকে 'দাম গ্রহীতা' (Price Taker) আখ্যা দেওয়া হয়।

এই পোস্টগুলি আপনার ভাল লাগতে পারে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন