ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু-মুসলিম বিরোধের কারণসমূহ - বিস্তারিত আলোচনা
প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং একটি চমৎকার মিশ্র সংস্কৃতির প্রচলন ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে এসে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম অবিশ্বাস, তিক্ততা ও বিরোধের সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িকতায় রূপ নেয়। এই বিরোধ কেবল ধর্মীয় ছিল না; এর পেছনে ব্রিটিশদের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ব্যাপকভাবে দায়ী ছিল।
ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু-মুসলিম বিরোধের প্রধান কারণগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
হিন্দু-মুসলিম বিরোধের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি। ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল যে, হিন্দু ও মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে ভারতে তাদের শাসন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না (যার প্রমাণ ছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ)। তাই তারা সুকৌশলে এক সম্প্রদায়কে অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে। কখনো হিন্দুদের সুবিধা দিয়ে মুসলমানদের বঞ্চিত করেছে, আবার কখনো মুসলমানদের খুশি করতে গিয়ে হিন্দুদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে।
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের মাঝে বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করে। এর ফলে মুসলমানরা তাদের জমিদারি ও ভূমি হারায় এবং ব্রিটিশদের অনুগত হিন্দু বেনিয়ারা নতুন জমিদার হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাংলার কৃষক শ্রেণির বেশিরভাগই ছিল মুসলমান এবং জমিদাররা ছিল হিন্দু। জমিদারদের মাত্রাতিরিক্ত কর ও শোষণ মুসলমানদের মনে হিন্দু জমিদারদের প্রতি তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়।
ব্রিটিশরা ফারসির বদলে ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা করলে মুসলমানরা ধর্মীয় ও আভিজাত্যের অহংকারে ইংরেজি শিক্ষাকে বর্জন করে। অন্যদিকে, হিন্দুরা দ্রুত ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকরি, অফিস-আদালত এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এই অসম বিকাশ মুসলমানদের সামাজিকভাবে অনেক পিছিয়ে দেয় এবং শিক্ষিত হিন্দু সমাজের প্রতি তাদের মনে ঈর্ষা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
উনিশ শতকের শেষদিকে হিন্দু সমাজে কিছু পুনরুত্থানবাদী ও চরমপন্থী আন্দোলনের উন্মেষ ঘটে। বাল গঙ্গাধর তিলকের 'শিবাজী উৎসব' ও 'গণপতি উৎসব' এবং স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর 'আর্য সমাজ' ও 'গোরক্ষা আন্দোলন' মুসলমানদের মনে তীব্র ভীতির সঞ্চার করে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' উপন্যাসের 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি মুসলমানদের কাছে হিন্দু আধিপত্যের প্রতীক বলে মনে হয়, যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানালেও হিন্দুরা এর তীব্র বিরোধিতা করে 'স্বদেশী আন্দোলন' শুরু করে। হিন্দুদের এই বিরোধিতাকে মুসলমানরা তাদের নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করলে মুসলমানরা চরমভাবে হতাশ হয় এবং হিন্দুদের প্রতি তাদের অবিশ্বাস স্থায়ী রূপ লাভ করে।
১৮৮৫ সালে সর্বভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলেও মুসলমান নেতারা (যেমন: স্যার সৈয়দ আহমদ খান) মনে করতেন কংগ্রেস মূলত হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষা করে। এরই প্রেক্ষিতে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ১৯০৬ সালে ঢাকায় 'মুসলিম লীগ' প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দুটি পৃথক রাজনৈতিক দলের উদ্ভব দুই সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক লক্ষ্যকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়।
১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইনে মুসলমানদের জন্য 'পৃথক নির্বাচন' প্রথা (Separate Electorate) চালু করা হয়। এর অর্থ ছিল, মুসলিম প্রার্থীদের কেবল মুসলিম ভোটাররাই ভোট দিতে পারবে। এই আইন হিন্দু ও মুসলমানদের রাজনৈতিকভাবে আইনি কাঠামোর মধ্যেই বিভক্ত করে ফেলে এবং সাম্প্রদায়িকতাকে সাংবিধানিক রূপ দেয়।
উনিশ শতকের শেষদিকে যুক্তপ্রদেশে (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) ফারসি হরফে লেখা উর্দুর পরিবর্তে দেবনাগরী হরফে লেখা হিন্দিকে সরকারি ভাষা করার দাবি ওঠে। হিন্দুরা হিন্দিকে এবং মুসলমানরা উর্দুকে নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ মনে করতে শুরু করে। এই ভাষা বিতর্ক হিন্দু-মুসলিম বিরোধকে আরও তীব্র করে।
| ক্রম | কারণ | বিবরণ | সময়কাল/তারিখ |
|---|---|---|---|
| ১ | ভাগ কর ও শাসন কর | ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি — সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি | ১৮৫৭-পরবর্তী |
| ২ | অর্থনৈতিক বৈষম্য | চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত — মুসলিম জমিদারি হ্রাস, হিন্দু জমিদারি বৃদ্ধি | ১৭৯৩ |
| ৩ | শিক্ষাক্ষেত্রে অসমতা | ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে হিন্দুরা অগ্রগামী, মুসলমানরা পিছিয়ে | ১৯শ শতক |
| ৪ | হিন্দু পুনরুত্থানবাদ | শিবাজী উৎসব, আর্য সমাজ, গোরক্ষা আন্দোলন — মুসলিম ভীতি | ১৯শ শতকের শেষ |
| ৫ | বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫ | হিন্দুদের বিরোধিতা, মুসলিমদের সমর্থন — দ্বন্দ্ব তীব্র | ১৯০৫-১৯১১ |
| ৬ | পৃথক রাজনৈতিক দল | কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ — পৃথক রাজনৈতিক লক্ষ্য | ১৮৮৫ ও ১৯০৬ |
| ৭ | পৃথক নির্বাচন | মর্লে-মিন্টো সংস্কার — সাম্প্রদায়িকতার সাংবিধানিক রূপ | ১৯০৯ |
| ৮ | হিন্দি-উর্দু বিতর্ক | ভাষা নিয়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব | ১৯শ শতকের শেষ |
পরিশেষে বলা যায়, হিন্দু-মুসলিম বিরোধ কোনো আকস্মিক বা কেবল ধর্মীয় কারণে সৃষ্ট ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ব্রিটিশদের সুকৌশলী বিভাজন নীতি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং উভয় সম্প্রদায়ের নেতাদের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার এক অনিবার্য ফল। এই বিরোধের জের ধরেই পরবর্তীতে দ্বি-জাতি তত্ত্বের উদ্ভব হয় এবং ১৯৪৭ সালে রক্তক্ষয়ী দেশভাগ ঘটে।
হিন্দু-মুসলিম বিরোধের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ব্রিটিশদের 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতি, যা সুকৌশলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল।
১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে মুসলমানরা জমিদারি হারায় এবং হিন্দু বেনিয়ারা জমিদার হয়। ফলে মুসলিম কৃষকদের ওপর হিন্দু জমিদারদের শোষণ বিরোধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯০৬ সালে ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইনে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন প্রথা চালু করা হয়, যেখানে কেবল মুসলিম ভোটাররা মুসলিম প্রার্থীদের ভোট দিতে পারতেন।
উনিশ শতকের শেষদিকে যুক্তপ্রদেশে ফারসি হরফের উর্দুর পরিবর্তে দেবনাগরী হরফের হিন্দিকে সরকারি ভাষা করার দাবি ওঠে, যা হিন্দু-মুসলিম ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে।