মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠনের প্রেক্ষাপট - বিস্তারিত আলোচনা
বিশ শতকের শুরুতে বাঙালি মুসলিম সমাজ যখন চরম রক্ষণশীলতা, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল, তখন তাদের চিন্তার জগতে এক বৈপ্লবিক আলোড়ন তুলেছিল 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ'। ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল প্রমুখ প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের এই মুক্তচিন্তার আন্দোলনকে বাংলার ইতিহাসে 'বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন' বলা হয়।
নিচে যে ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' গঠিত হয়েছিল, তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
উনিশ শতকে হিন্দু সমাজে রামমোহন রায় বা বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে নবজাগরণ ঘটলেও, মুসলিম সমাজ তার থেকে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। বিশ শতকের প্রথম দিকেও বাঙালি মুসলিম সমাজ ফতোয়া, পীরপ্রথা, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারে আবদ্ধ ছিল। আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্কতার চরম অভাব ছিল। সমাজের এই স্থবিরতা ও পশ্চাৎপদতা দূর করে জাতিকে আধুনিক চিন্তায় উজ্জীবিত করার তাগিদেই মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠনের সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের জন্য আধুনিক শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। এখানে পড়ার সুবাদে একদল তরুণ ও প্রগতিশীল মুসলিম বুদ্ধিজীবী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আড্ডায় যে মুক্তচিন্তা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়, তারই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ'।
তৎকালীন মুসলিম সমাজে স্বাধীন চিন্তার কোনো অবকাশ ছিল না; সবকিছুতে অন্ধ অনুকরণ বা 'তাকলিদ' করার প্রবণতা ছিল। প্রগতিশীল তরুণরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, যুক্তিবাদ ছাড়া সমাজের মুক্তি অসম্ভব। এই উপলব্ধি থেকেই তারা 'বুদ্ধির মুক্তি' (Emancipation of Intellect) আন্দোলনের সূচনা করেন। এই সংগঠনের মুখপত্র ছিল 'শিখা' পত্রিকা। এই পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার শুরুতে লেখা থাকত তাদের মূলমন্ত্র— "জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।"
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক যে আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছিলেন, তা বাঙালি মুসলিম তরুণদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তারা উপলব্ধি করেন যে, ধর্মকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরে আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তুরস্কের এই রেনেসাঁ বা নবজাগরণের চেতনা তাদেরকে বাংলার মুসলিম সমাজে একটি প্রগতিশীল আন্দোলন গড়ে তুলতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
তৎকালীন অনেক রক্ষণশীল মুসলিম মনে করতেন যে বাংলা ভাষা হিন্দুদের ভাষা, তাই তারা উর্দু বা ফারসির দিকে বেশি ঝুঁকেছিলেন। ফলে বাংলা সাহিত্যে মুসলিমদের অবদান সীমিত হয়ে পড়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম এবং বেগম রোকেয়ার সাহিত্যকর্ম তরুণদের অনুপ্রাণিত করলেও একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব ছিল। মুসলিম সমাজকে তাদের মাতৃভাষা বাংলার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং বাংলা সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িক ও আধুনিক চিন্তার অনুপ্রবেশ ঘটানোর লক্ষ্যেই এই সাহিত্য সমাজ গড়ে ওঠে।
এই সমাজের প্রতিষ্ঠাতারা কেউ ধর্মবিরোধী ছিলেন না, কিন্তু তারা ধর্মের নামে চলা গোঁড়ামি ও ভণ্ডামির বিরোধী ছিলেন। তারা কোরআন ও হাদিসকে অন্ধভাবে মুখস্থ করার বদলে যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণের পক্ষে ছিলেন। মানুষের মানবিক মূল্যবোধকে তারা সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন।
| ক্রম | প্রেক্ষাপট | বিবরণ | সময়কাল |
|---|---|---|---|
| ১ | সমাজের স্থবিরতা | ফতোয়া, পীরপ্রথা, অন্ধবিশ্বাস — আধুনিক শিক্ষার অভাব | বিশ শতকের শুরু |
| ২ | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | আধুনিক শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত — প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী শ্রেণি | ১৯২১ |
| ৩ | বুদ্ধির মুক্তি | অন্ধ অনুকরণ (তাকলিদ) রোধ — যুক্তিবাদ প্রতিষ্ঠা | ১৯২০-এর দশক |
| ৪ | কামাল আতাতুর্কের প্রভাব | তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কার — প্রেরণা | ১৯২০-এর দশক |
| ৫ | বাংলা সাহিত্য চর্চার অভাব | উর্দু/ফারসি প্রতি ঝোঁক — বাংলা ভাষার প্রতি অনীহা | বিশ শতকের শুরু |
| ৬ | ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা | যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ — মানবিক মূল্যবোধ | ১৯২০-এর দশক |
পরিশেষে বলা যায়, 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' গঠন ছিল ঘুমন্ত ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন বাঙালি মুসলিম সমাজকে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে তোলার একটি সাহসী পদক্ষেপ। যদিও রক্ষণশীল সমাজের তীব্র বিরোধিতায় ১৯৩৬ সালের পর এই সংগঠনের কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ে, তবুও এটি বাঙালি মুসলিমদের চিন্তার জগতে যে যুক্তিবাদ ও মুক্তচিন্তার বীজ বপন করেছিল, তা আধুনিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গঠনে অনস্বীকার্য ভূমিকা রেখেছে।
১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতারা হলেন — আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন ও আবুল ফজল।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র ছিল 'শিখা' পত্রিকা।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের মাধ্যমে যে মুক্তচিন্তার আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা 'বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন' নামে পরিচিত। এর মূলমন্ত্র ছিল — "জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।"
তুরস্কে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কার কার্যক্রম মুসলিম সাহিত্য সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।